নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে বাড়তি দামের চাপের মধ্যেই এবার বাড়ানো হয়েছে পাউরুটি, বিস্কুট, কেকসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যের দাম। নতুন মূল্য অনুযায়ী, ১০০ টাকায় বিক্রি হওয়া দুই পাউন্ডের পাউরুটির দাম বেড়ে হয়েছে ১২০ টাকা। একইভাবে ৫০ টাকার এক পাউন্ড পাউরুটির দাম বাড়িয়ে করা হয়েছে ৬০ টাকা। কোনো কোনো বেকারি পণ্যের দাম সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে।
গত ৯ সেপ্টেম্বর বেকারি পণ্যের নতুন দাম কার্যকর করার ঘোষণা দেয় ‘ব্রেড, বিস্কুট অ্যান্ড কনফেকশনারি প্রস্তুতকারক সমিতি’। ঘোষণার পর দুই দিন কারখানা বন্ধ রেখে নতুন দর কার্যকরের প্রস্তুতি নেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। এরপর শনিবার থেকে বাড়তি দরে উৎপাদন ও বাজারজাত শুরু হয়।

পাউরুটি-বিস্কুটের পাশাপাশি বেড়েছে অন্যান্য পণ্যের দাম
নতুন দরে শুধু পাউরুটি নয়, বিস্কুট, কেক, বাটার বনসহ বিভিন্ন বেকারি পণ্যের দামও বাড়ানো হয়েছে। সাধারণ চায়ের দোকানে আগে ১০ টাকায় বিক্রি হওয়া কিছু বেকারি পণ্যের দাম এখন ১৫ টাকা করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সমিতির সভাপতি জালাল উদ্দিন বলেন, রুটি, বিস্কুট, কেক, বাটার বনসহ সব ধরনের বেকারি পণ্যের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কিছু পণ্যের ওজন কমিয়ে দাম সমন্বয় করা হয়েছে, আবার কিছু পণ্যের দাম সরাসরি বাড়ানো হয়েছে। সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত দাম বেড়েছে।

উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে, দাবি ব্যবসায়ীদের
ব্যবসায়ীদের দাবি, গত কয়েক মাসে বেকারি শিল্পে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ময়দা, চিনি ও ভোজ্যতেলের মতো প্রধান কাঁচামালের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। এতে কাঁচামালের খরচের পাশাপাশি কারখানা পরিচালনার ব্যয়ও বেড়েছে।
জালাল উদ্দিন বলেন, উৎপাদন খরচ অতিমাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় সমিতির সদস্যরা সম্মিলিতভাবে দাম সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে অনেক বেকারি স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। আগে ভোরের আগেই যেসব কারখানায় পাউরুটি, কেক ও বিস্কুট তৈরির কাজ শুরু হতো, এখন সেগুলোর অনেকগুলোকে দিনের বড় একটি সময় বন্ধ রাখতে হচ্ছে। এতে ছোট উদ্যোক্তারা বেশি সমস্যায় পড়ছেন।
দাম বাড়ায় ক্ষোভ ভোক্তাদের
ব্যবসায়ীদের উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধির যুক্তির বিপরীতে ভোক্তাদের প্রশ্ন—প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় থাকা তুলনামূলক কম দামের এসব পণ্যের দাম একসঙ্গে এতটা বাড়বে কেন?
সাধারণ ক্রেতাদের অভিযোগ, আয় বা বেতন বাড়েনি; অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রায় সব পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। এর মধ্যে পাউরুটি, বিস্কুট ও অন্যান্য বেকারি পণ্যের দাম বাড়ায় পরিবারের দৈনন্দিন ব্যয় আরও বেড়ে যাবে।
বিক্রি কমেছে খুচরা বাজারে
হঠাৎ করে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারেও। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকার খুচরা বিক্রেতা ও চা-দোকানিরা বলছেন, নতুন দাম কার্যকর হওয়ার পর বেকারি পণ্যের বিক্রি কমে গেছে।
বিক্রেতাদের ভাষ্য, আগে যেসব পণ্য দুপুরের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যেত, সেগুলোর একটি অংশ এখন দিনের শেষেও অবিক্রীত থাকছে। অনেক ক্রেতা আগের তুলনায় কম পরিমাণে পণ্য কিনছেন। কেউ কেউ বাড়তি দাম শুনে পণ্য না কিনেই ফিরে যাচ্ছেন।
সব বেকারিতে কার্যকর হয়নি নতুন দাম
তবে সমিতির নির্ধারিত নতুন দাম সব বেকারি অনুসরণ করছে না। রাজধানীর মানিকনগরের ভাণ্ডারি বেকারির স্বত্বাধিকারী মো. আকাইদ হোসেন জানান, তারা সমিতির বাড়ানো দাম অনুসরণ করছেন না।
তিনি বলেন, উৎপাদন খরচ ও পণ্যের মান বিবেচনায় নিয়ে তারা আগেই নিজেদের পণ্যের দাম নির্ধারণ করেছেন। বাজারের প্যাকেটজাত বিস্কুট, কেক ও রুটির তুলনায় তাদের পণ্যের মান উন্নত হওয়ায় মান অনুযায়ী কিছুটা বেশি দাম নেওয়া হয়। সমিতির নতুন ঘোষণার সঙ্গে তারা আর দাম সমন্বয় করেননি।
মুগদা বাজারের এক বেকারি ব্যবসায়ীও একই কথা জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, তাদের বেকারিতেও সমিতির বর্ধিত দাম অনুসরণ করা হচ্ছে না। বিভিন্ন আকার ও ধরনের কেক, বিস্কুট, পাউরুটি ও বাটার বন উৎপাদন করা হয়। এসব পণ্যের উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় নিয়ে গত জুন মাসেই দাম সমন্বয় করা হয়েছে। তাই নতুন করে সমিতির ঘোষিত মূল্যবৃদ্ধির কারণে তারা আর দাম বাড়াবেন না।
এলাকাভেদে ভিন্ন দাম, বিভ্রান্তিতে ক্রেতারা
ব্যবসায়ীদের ভিন্ন সিদ্ধান্তের কারণে একই ধরনের বেকারি পণ্যের ক্ষেত্রে একেক এলাকায় একেক দামের চিত্র দেখা যাচ্ছে। কোথাও সমিতির নির্ধারিত নতুন দর কার্যকর হয়েছে, আবার কোথাও আগের দামেই বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোক্তাদের মধ্যে বিভ্রান্তিও তৈরি হচ্ছে।
সব মিলিয়ে উৎপাদন ব্যয় সামাল দিতে ব্যবসায়ীদের মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব পড়েছে ভোক্তার পকেটে। বিশেষ করে ১০০ টাকার পাউরুটি ১২০ টাকা এবং ১০ টাকার বেকারি পণ্য ১৫ টাকা হওয়ায় সীমিত আয়ের পরিবারগুলোর নিয়মিত খাদ্য ব্যয় আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
নিত্যপণ্যের বাজারে চলমান বাড়তি চাপের মধ্যে বেকারি পণ্যের এই নতুন মূল্যবৃদ্ধি ভোক্তাদের জন্য আরও একটি বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।