ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আটতলা ভবনের আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও রোগী ও তাঁদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক কাটেনি। আজ মঙ্গলবার সকাল সাতটার দিকে ভবনটির বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে রোগী ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে। অনেক স্বজন অগ্নিকাণ্ডের স্থান ঘুরে দেখছিলেন।

হাসপাতালে অন্তত ১০ জন রোগী ও স্বজনের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। তাঁদের একজন তারাকান্দা উপজেলার কাশিগঞ্জের আবদুল করিম। হাসপাতালের পঞ্চম তলার নেফ্রোলজি বিভাগে ভর্তি এই রোগী গতকাল সোমবারের দুর্ঘটনার বিষয়ে বলেন, আগুন লাগার পর সবাই হইচই শুরু করেন। তিনি ওই সময় মেঝেতে চিকিৎসাধীন ছিলেন। তাঁর সামনেই একটি সিঁড়ি ছিল। সেটি দিয়ে নিচে নেমে তালা দেখতে পান। পরে তালা ভেঙে বের হন কয়েকজন। না বের হতে পারলে কী হতো, সেই ভয়–আতঙ্ক এখনো তাঁর মনে।

হাসপাতালের অষ্টম তলায় আগুনে পোড়া অংশ দেখছিলেন হাম আইসোলেশন ওয়ার্ডে ভর্তি রোগীদের স্বজনেরা। তাঁদের একজন হাদিসা খাতুন বলেন, ‘হুট করে চতুর্দিক (চারদিক) ধোঁয়া দেহি। আমরা নিচে নামবার পাই নাই। সবাইরে বিল্ডিংয়ের এক দিকে রাখা হয়ছিল।’

আগুন বেশি না ছড়ালেও ধোঁয়ার কারণে অনেকে বমি করছিলেন এবং অসুস্থ বোধ করছিলেন বলে দাবি হাদিসার। শিশুদের নিয়ে একটি কক্ষের এক কোণে থাকার পর আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে তাঁদের আবার ওয়ার্ডে নেওয়া হয়। পরে চিকিৎসকেরা এসে রোগীদের দেখে যান বলে তিনি জানান।

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লেগে বাইরের অংশ পুড়ে যায়

ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১ নম্বর লিফটে আগুন লেগে বাইরের অংশ পুড়ে যায়

গতকাল বিকেল ৫টা ৫৫ মিনিটের দিকে হাসপাতালটির ১১ নম্বর লিফটে আগুন লাগে। এতে লিফটের বাইরের আবরণ পুড়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। আগুন লাগার পর হাসপাতালের বিভিন্ন তলা থেকে রোগী ও স্বজনদের অনেকে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে আহত হন। এ ঘটনায় চারজনের মৃত্যুর তথ্য সামনে এলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন তা নাকচ করেছে।

হাসপাতালটির উপপরিচালক জাকিউল ইসলাম বলেন, আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনেরা নিচে নেমে যান। পরে আগুন নিয়ন্ত্রণে এলে মাইকিং করে রোগীদের নিজ নিজ ওয়ার্ডে ফিরে যেতে বলা হয়।

ফেসবুকে ছড়ানো রেজিস্টারের তথ্য নিয়ে ধোঁয়াশা

এদিকে এই ঘটনার পর হাসপাতালের একটি রেজিস্টারের পাতার ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার পর পুলিশের কাছ থেকে পাওয়া হতাহত ব্যক্তিদের তথ্যের সঙ্গে ওই রেজিস্টারের তথ্যের মিল আছে। রেজিস্টারের পাতাটি হাসপাতালের বলে নিশ্চিত করেছেন হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান।

রেজিস্টারের ওই পাতায় পাঁচজনের তথ্য আছে। তাঁদের মধ্যে ফুলবাড়িয়া উপজেলার জাহানারা বেগম (৫০) ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনের নামের পাশে ‘ব্রট ডেড’ (মৃত অবস্থায় হাসপাতালে আনা) লেখা আছে।

রেজিস্টার অনুযায়ী, তারাকান্দা উপজেলার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তার (৩৫) সন্ধ্যা সাড়ে সাতটায় ও ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির (৪৫) সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে মারা যান। স্বজনদের দাবি, তাঁরা পদদলিত হয়ে মারা গেছেন।

এই ভবনে ঘটে দুর্ঘটনা

এই ভবনে ঘটে দুর্ঘটনা

অন্যদিকে পূর্বধলা উপজেলার নারান্দিয়া ইউনিয়নের ভূগী জাওয়ানী গ্রামের আইয়ুব আলীর স্ত্রী হাজেরা বেগম (৫০) সন্ধ্যা ৬টা ৩৫ মিনিটে এবং ফুলবাড়িয়া উপজেলার কালাদহ ইউনিয়নের বিদ্যানন্দ গ্রামের রমজান আলী (৩৮) সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে মারা যান বলে নথিতে উল্লেখ আছে।

এই চারজনের মৃত্যুর বিষয়ে মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, পদদলিত হয়ে মারা গেলে শরীরে যে ধরনের চিহ্ন বা উপসর্গ থাকার কথা, সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকেরা ওই চারজনের শরীরে তেমন কোনো চিহ্ন পাননি। তাঁরা কীভাবে মারা গেছেন, সেটিও তদন্তের আওতায় থাকবে।

হাসপাতালের রেজিস্টারে চারজনকে ‘ব্রট ডেড’ এবং ঘটনার ধরন হিসেবে ‘ফায়ার অ্যাকসিডেন্ট’ লেখার বিষয়ে মাইনউদ্দিন খান বলেন, ঘটনার পর কতজন হাসপাতালে এসেছেন, তার হিসাব রাখার জন্য সংশ্লিষ্ট নার্স রেজিস্টারে ‘ফায়ার অ্যাকসিডেন্ট’ লিখে ওই চারজনের নাম অন্তর্ভুক্ত করেছেন। এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা আগুনে মারা গেছেন।

এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আজ সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই কমিটি গঠন করে।

পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। আজ সকালে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এই কমিটি গঠন করে।

বিষয়টি নিশ্চিত করে মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, কমিটির প্রধান করা হয়েছে হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে। তিনি নিজেই সদস্যসচিবের দায়িত্ব পালন করবেন। এ ছাড়া গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি আছেন।

মাইনউদ্দিন খান বলেন, লিফটে আগুন লাগার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত কমিটি তা খতিয়ে দেখবে। ঘটনায় কারও গাফিলতি থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। তদন্তে অন্য কোনো বিষয় উঠে এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।