১৯০৩ থেকে পথচলা, ঐতিহ্যের ১২৩ বছরে মুশুলী উচ্চ বিদ্যালয়

নান্দাইল (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি:

ময়মনসিংহের নান্দাইল উপজেলার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান মুশুলী উচ্চ বিদ্যালয়। দীর্ঘ এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে প্রতিষ্ঠানটি এ অঞ্চলের শিক্ষাবিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। স্থানীয় বিভিন্ন তথ্যসূত্র অনুযায়ী, বিদ্যালয়টির শিক্ষাযাত্রার সূচনা ১৯০৩ সালে একটি মিডল ইংলিশ (এম.ই.) বা মাইনর স্কুল হিসেবে।

জমিদারের কাচারির বারান্দায় পাঠদান

স্থানীয় ইতিহাস ও প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৯০৩ সালে এলাকার শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি ও জমিদারদের উদ্যোগে বিদ্যালয়টির সূচনা হয়। তৎকালীন স্থানীয় জমিদার বাবু উপেন্দ্র নাথ রায়ের কাচারিঘরের বারান্দায় শিক্ষার্থীদের নিয়ে শুরু হয় পাঠদান কার্যক্রম।

প্রতিষ্ঠার শুরুর দিকে বিদ্যালয়টি মাইনর স্কুল হিসেবে পরিচালিত হতো। সে সময় গ্রামীণ জনপদে, বিশেষ করে মুসলিম সমাজের একটি অংশের মধ্যে ইংরেজি শিক্ষার প্রতি অনীহা থাকলেও ধীরে ধীরে বিদ্যালয়টি এলাকার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের যাত্রার শুরুতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১৩৫ জন।

প্রথম প্রধান শিক্ষক উমেশ চন্দ্র চক্রবর্তী

বিদ্যালয়ের প্রথম প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বাবু উমেশ চন্দ্র চক্রবর্তী। প্রথম দিকের শিক্ষকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন বাবু সতীশ চন্দ্র দেব। তাঁদের প্রচেষ্টা ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষা কার্যক্রম বিস্তৃত হতে থাকে।

শতবর্ষের পথচলায় বহু কৃতী শিক্ষার্থী

দীর্ঘ পথচলায় মুশুলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন দেশের অনেক বরেণ্য ব্যক্তি। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ এবং বীর প্রতীক খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও সাবেক স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আবদুল মতিনসহ অনেকে।

ফলে শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবেই নয়, মুশুলী উচ্চ বিদ্যালয় এ অঞ্চলের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে উঠেছে।

১৯৪১ সাল নিয়ে রয়েছে ভিন্ন তথ্য

বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাকাল নিয়ে স্থানীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক তথ্যসূত্রে কিছুটা ভিন্নতা পাওয়া যায়। কোনো কোনো সূত্রে ১৯০৩ সালকে বিদ্যালয়ের সূচনাকাল হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার কিছু স্থানীয় ও প্রাথমিক সূত্রে ১৯৪১ সালকে প্রতিষ্ঠানটির প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভের বছর হিসেবে উল্লেখ করা হয়।

অর্থাৎ, ১৯০৩ সালে মাইনর বা এম.ই. স্কুল হিসেবে যে শিক্ষাযাত্রার সূচনা হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠানটি স্থায়ী রূপ লাভ করে এবং ধীরে ধীরে পূর্ণাঙ্গ উচ্চ বিদ্যালয়ে পরিণত হয়।

উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কলেজ

সময়ের সঙ্গে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি, এলাকাবাসীর প্রচেষ্টা এবং প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে মুশুলী উচ্চ বিদ্যালয় মাইনর স্কুল থেকে পূর্ণাঙ্গ উচ্চ বিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।

পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির শিক্ষাকার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত হয়। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, আশি ও নব্বইয়ের দশকে কলেজ পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয় এবং ১৯৯৫ সালে কলেজ হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

ঐতিহ্য ধরে এগিয়ে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি

একদিকে ব্রিটিশ আমলে শিক্ষার বিস্তারে ভূমিকা, অন্যদিকে স্বাধীন বাংলাদেশের বহু কৃতী মানুষের শিক্ষাজীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা—সব মিলিয়ে মুশুলী উচ্চ বিদ্যালয় নান্দাইলের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

শতবর্ষের বেশি সময়ের এই দীর্ঘ পথচলায় প্রতিষ্ঠানটি নানা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেলেও শিক্ষা বিস্তারের মূল লক্ষ্যকে ধারণ করে এগিয়ে চলছে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, ঐতিহ্য ও গৌরব ধরে রেখে প্রতিষ্ঠানটি ভবিষ্যতেও নান্দাইল অঞ্চলের শিক্ষাক্ষেত্রে আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।