কৃষি তাঁর ধ্যানজ্ঞান। চার দশকের বেশি সময় ধরে দেশের কৃষি, কৃষক ও গ্রামীণ জীবনের কথা গণমাধ্যমে তুলে ধরছেন তিনি। কখনো মাঠে দাঁড়িয়ে কৃষকের সাফল্যের গল্প শুনিয়েছেন, কখনো কৃষির সমস্যা ও সম্ভাবনাকে নিয়ে এসেছেন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রে। উন্নয়ন সাংবাদিকতার অগ্রপথিক সেই শাইখ সিরাজের জন্মদিন আজ। ১৯৫৪ সালের ৭ সেপ্টেম্বর চাঁদপুরে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। আজ ৭২ বছর পূর্ণ করলেন এই কৃষি উন্নয়ন ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।
শাইখ সিরাজ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভূগোলে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। ছাত্রজীবনেই বাংলাদেশ টেলিভিশন, বেতার ও সংবাদপত্রের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। বাংলাদেশ টেলিভিশনের ‘মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠান উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে সব শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিপুল গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেন তিনি।
পরে শাইখ সিরাজের নিজস্ব পরিচালনাধীন টেলিভিশন চ্যানেল আইয়ে শুরু করেন কৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’। উন্নয়ন সাংবাদিকতায় অবদানের জন্য তিনি বাংলাদেশের সর্বোচ্চ দুই রাষ্ট্রীয় সম্মান—স্বাধীনতা পুরস্কার (২০১৮) ও একুশে পদক (১৯৯৫) লাভ করেন।
কৃষিকে নিয়ে এসেছেন জাতীয় আলোচনায়
টেলিভিশনসহ গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রায় চার দশকের একনিষ্ঠ পথচলার মধ্য দিয়ে শাইখ সিরাজ উন্নয়ন সাংবাদিকতার অগ্রপথিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। গণমাধ্যমে তাঁর উদ্বুদ্ধকরণ প্রচারণায় বাংলাদেশের কৃষিতে আমূল পরিবর্তন এসেছে। খাদ্য উৎপাদনে সূচিত হয়েছে বৈপ্লবিক সাফল্য। গ্রামীণ জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। দেশের অর্থনীতিতে কৃষির বহুমুখী অবদানের বিষয়টিও উঠে এসেছে সামনে।

‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানে শাইখ সিরাজ (ডানে)
কৃষিকে একসময় গণমাধ্যমে অনেকটা নীরস বিষয় হিসেবে দেখা হতো। সেই কৃষিকেই তিনি জাতীয় সংবাদের প্রধান খবরের পর্যায়ে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। কৃষি ও কৃষকের সমস্যা, সাফল্য, উদ্ভাবন এবং সম্ভাবনার গল্প পৌঁছে দিয়েছেন দেশের সব শ্রেণি-পেশার মানুষের কাছে। এর আগে শাইখ সিরাজের জন্মদিনে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও জননীতি বিশ্লেষক দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য তাঁর কাজের মূল্যায়ন করে লিখেছিলেন, ‘শাইখ সিরাজ, একজন জাতীয়ভাবে পুরস্কৃত ব্যক্তিত্ব, যাঁর বহুবিধ পরিচয় আছে। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক বিবর্তনের একটি বিশেষ মুহূর্তে তাঁর আবির্ভাব। দেশজ আয়ে কৃষি খাতের অবদান যখন কমে আসছে, এমন একটি সময়ে এই খাতের অপার সম্ভাবনাকে তিনি জাতির সামনে নবরূপে উন্মোচন করেছেন। কৃষির বহুমুখীকরণ, অপ্রচলিত পণ্যকে জনপ্রিয়করণ, কৃষির যান্ত্রিকীকরণ ও উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বৈশ্বিক অভিজ্ঞতাকে দেশে আত্তীকরণ, নগরজীবনের সঙ্গে প্রকৃতির সহযোগ সাধনসহ আরও বহু বিষয়ে জ্ঞানের সম্প্রসারণ এবং সামাজিক সচেতনতার জন্য তিনি পথিকৃৎ হিসেবে বিবেচিত হবেন। এসব কাজের মাধ্যমেই তিনি কৃষি খাতে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি করেছেন। বিশেষ করে তিনি তরুণসমাজকে আধুনিক কৃষিকাজে যুক্ত হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং তাঁদের উপযুক্ত সামাজিক সম্মান পাওয়ার দাবিকে সোচ্চার করেছেন। একই সঙ্গে তিনি গ্রামীণ সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধরে রাখা ও জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রে গণমাধ্যমকে ফলপ্রসূভাবে ব্যবহার করেছেন।’

স্বীকৃতিদেশে-বিদেশে
যুক্তরাষ্ট্রেরঅশোকা ফেলো শাইখ সিরাজখাদ্যনিরাপত্তা ও দারিদ্র্য বিমোচনবিষয়ে সাংবাদিকতায় অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০৯ সালে জাতিসংঘেরখাদ্য ও কৃষি সংস্থারএ এইচ বুর্মা অ্যাওয়ার্ডঅর্জন করেন। এ ছাড়া তিনিএশিয়ার মর্যাদাপূর্ণ গুসি পিস প্রাইজও ব্রিটেনের বিসিএ গোল্ডেন জুবিলি অনার অ্যাওয়ার্ডস পেয়েছেন।ব্রিটিশ হাউস অব কমনসতাঁকে বিশেষ সম্মাননা দিয়েছে। ব্রিটিশ বাংলাদেশি ব্যবসায়ী সংগঠন তাঁকে দিয়েছে গ্রিন অ্যাওয়ার্ড। এ ছাড়া শাইখসিরাজ বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির স্বর্ণপদক, ডা. ইব্রাহিম মেমোরিয়ালস্বর্ণপদক, রণদা প্রসাদ সাহাস্বর্ণপদকসহ অর্ধশত দেশি-বিদেশি পুরস্কারও সম্মাননা পেয়েছেন। শাইখ সিরাজ বর্তমানেইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড ও চ্যানেল আইয়েরপ্রতিষ্ঠাতা পরিচালক এবং বার্তাপ্রধান হিসেবেদায়িত্ব পালন করছেন। চ্যানেলআই ও বাংলাদেশ টেলিভিশনেকৃষিবিষয়ক অনুষ্ঠান নির্মাণ ও উপস্থাপনার পাশাপাশিবিভিন্ন গণমাধ্যমে নিয়মিত লিখছেন।
দীর্ঘদিনেরবন্ধু শাইখ সিরাজের কর্মনিষ্ঠাও কৃষির প্রতি নিবেদন নিয়ে লেখক ইমদাদুলহক মিলন লিখেছেন, ‘একজনমানুষ কতটা কর্মঠ হতেপারেন, আমার বন্ধু শাইখসিরাজ তার প্রমাণ। দেশেরকৃষিক্ষেত্রে বহু বছর ধরেঅনবদ্য সব অবদান রেখেচলেছেন তিনি। শুরু করেছিলেন বাংলাদেশটেলিভিশন থেকে। “মাটি ও মানুষ” নামে অনুষ্ঠান করতেন। “চ্যানেল আই” তার যাত্রাশুরু করার পর থেকেএই চ্যানেলে তিনি শুরু করলেন “হৃদয়ে মাটি ও মানুষ”। কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠানযে এত জনপ্রিয় হয়েউঠতে পারে, তার প্রমাণ শাইখেরএই দুটি অনুষ্ঠান। তাঁরধ্যান-জ্ঞান-প্রেম—সবই বাংলাদেশের কৃষিব্যবস্থাও কৃষককে নিয়ে। সারাক্ষণই কৃষি ও কৃষকনিয়ে মাথা খাটিয়ে চলেছেন।কী করলে কৃষির উন্নতিহবে, কৃষকের উন্নতি হবে, এই ভাবনায়মগ্ন হয়ে আছেন।’

‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’অনুষ্ঠানে ববিতা ও শাইখ সিরাজ
লেখালেখিতেও কৃষি ও উন্নয়ন টেলিভিশনের পাশাপাশি লেখালেখির মাধ্যমেও কৃষি ও উন্নয়নের নানা দিক তুলে ধরেছেন শাইখ সিরাজ। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘মৎস্য ম্যানুয়েল’, ‘মাটি ও মানুষের চাষবাস’, ‘ফার্মার্স ফাইল’, ‘মাটির কাছে মানুষের কাছে’, ‘বাংলাদেশের কৃষি: প্রেক্ষাপট ২০০৮’, ‘কৃষি ও গণমাধ্যম’, ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’ (সম্পাদিত), ‘আমার স্বপ্নের কৃষি’, ‘কৃষি বাজেট কৃষকের বাজেট’, ‘সমকালীন কৃষি ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ এবং ‘কৃষি ও উন্নয়নচিন্তা’।